শুক্রবার, ৪ জানুয়ারী, ২০১৩

"ভালবাসার দু ফোঁটা অশ্রজল"

রাত বারোটা । অথচ নতুন বছরের শুভেচ্ছা দিয়ে কোন মেসেজই আসছে না। রাগে নিজের চুলগুলো নিজেই ছিড়তে ইচ্ছে করছিল রোদসীর। বছরের প্রথম দিনটাই মাটি করে দিল রঙ্গন । কেন যে ওর সাথে মিছে মিছে রাগ করতে গেল । আর ওই বা কেমন ছেলে একটা ফোন দিলেই তো হয়।
রঙ্গনকে কি একটা ফোন দেওয়া যেতে পারে। ফোনটা হাতে নিয়ে কি মনে করে জানি আবার রেখে দিল রোদসী। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তূ বরাবরই ব্যর্থ । বার বার চোখের সামনে রঙ্গনের মুখটাই ভেসে উঠছে। রাগলে রঙ্গনের ফর্সা মুখটা কেমন জানি আরো ফর্সা হয়ে যায়। আর রঙ্গনের এই টাইপের মুখটাই দেখতে রোদসীর খুব ভালো লাগে । তাই রঙ্গনকে বার বার রাগিয়ে দেয় ও।আর কাল রাগাতে গিয়েই তো বিপত্তি টা বাধলো ।
রঙ্গন বলেছিল বছরের প্রথমদিনটা স্মরনীয় রাখতে দুজনে সারা দিন রিকশা করে ঘুরে বেড়াবে। বিকেলের শেষ সময়টায়, দুজনের প্রথম দেখা হওয়া জায়গাটার শেষ কোনাটায় দুজনে হাত ধরে অনেকটা সময় নীরবে বসে থাকবে।
এটা শুনে রোদসী মনে মনে খুশিই হয়েছিল।কাল সারাটাদিন রঙ্গনকে কাছে পাওয়া যাবে। তারপরও রঙ্গনের ফর্সা মুখটা আরও ফর্সা করার জন্যেই বললো -কাল আমিতোমাকে একেবারেই সময় দিতেপারবো না । কাল আমাদের সব বান্ধবী দের নিয়ে একটা পার্টি আছে। আর সেখানে আমার থাকতেই হবে। সরি রঙ্গন অন্য কোনো দিন না হয়।
-রঙ্গনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। অল্পতেই রেগে যায় ছেলেটা ।
অনেকটা উত্তেজিত হয়ে বলতেলাগল
-তুমি যাবা না । আমার চেয়েওই পার্টিটাই তোমার কাছে ইমফরটান্ট হয়ে পড়ল। তোমারযখন আমাকে নিয়ে ঘুরতে ইচ্ছে করে আমি তো সমস্ত কাজ ফেলে চলে আসি। আর এখন আমি বললাম আর তুমি না করে ফেললে ।থাক, তোমার যেতে হবে না আমার সাথে।
রোদসী শুধুই অবাক চোখে রঙ্গনের রাগ মাখা মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল । রঙ্গন কি বলছিল সেটা ওর কানেই গেল না ।
-তুমি জানি এতোক্ষন কি বলছিলা রঙ্গন, মিটি মিটি হাসিতে জিজ্ঞাস করলো রোদসী ।
এটা শুনে তো রঙ্গন আরো রেগে গেল।
-আমি এতো ক্ষন তাহলে কার সাথে কথা বললাম । যেতে হবেনা আমার সাথে । থাক, তুমি তোমার পার্টি নিয়ে। আর হ্যা আমার সাথে সাবধান কথা বলার চেষ্টা করবা না ।
রঙ্গন যখন কথা গুলো বলছিল ওর চোঁখ জোড়া খুব সুন্দর করে কাপছিল ।
আর তা দেখে রোদসীর হাসিটা যেন ক্রমেই বেড়ে যেতে লাগল।
রঙ্গন রেগে চলে যেতে চাইলে রোদসী ওর হাতটা খুব শক্ত করে ধরল।
-আমাকে এখানে একা ফেলে চলে যাবা।
-হ্যা তুমি থাক একা একা। বলে ও হাতটা জোড় করে ছাড়িয়ে নিল ।আর সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
পিছন থেকে রোদসী অনেক বার ডাক দিল। কিন্তু রঙ্গন একবারো পিছু ফিরে থাকালো না ।
-স্যরি রঙ্গন। আমি তোমার সাথে এতো ক্ষন ফান করেছিলাম। প্লিজ যেও না । কথাগুলো চিত্‍কার করে বলছিল রোদসী।
রঙ্গন আর পিছন ফিরে তাকাল না । দূর অজানায় আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল ।
আর রোদসী ওই জায়গায় অনেক ক্ষন স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইল । আর চোখের জল গুলো গাল বেয়ে পড়ছিল।
যত বারই ওদের মাঝে মান অভিমান হয় শেষে রঙ্গনকেই রাগ ভাঙ্গাতে হয় । কিন্তু আজ কেন ও ফোন করছে না ।কেন ওর নাম্বার খেকে কোন এস এমএস আসছে না । ভাবতে ভাবতে আর একবার নিজেকে নোনা জলে সিক্ত করল রোদসী।
কিন্তু ওর বার বার মনে হচ্ছিল রঙ্গন ওকে ফোন না করে থাকতেই পারবে না ।
হঠাত্‍ করে ফোনটা বেজে উঠল । রঙ্গনের ফোন । মূহুতেই রোদসীর মুখটা উজ্জল হয়ে গেলো ।
ফোনটা কানে নিয়ে কিছুই বলতে পারল না রোদসী। কান্না গুলো চেপে রাখতে গিয়ে বোবার মতো চুপ করে খাকল।
-এই পাগলি মেয়ে আমায় একটা ফোন করলে কি এমন হতো । আমি তোর ফোনের আশায় কখন থেকে বসে আছি। সারা জীবন কি আমিই রাগ ভাঙ্গিয়ে রাগ যাবো ।
রোদসী এবার কেদেই ফেলল । আর কাদা কাদা গলায় বললো,
I love u, রঙ্গন । আর কখনো এমনটি হবে না । প্লিজ আমায়ছেড়ে যেয়ো না । তাহলে আমি মরেই যাব।
রঙ্গন মিষ্টি হাসির একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে বললো, তোমায় ছেড়ে আমি কোথায় যাবো । আমি কি বাচতে পারবো?
বিকাল তিনটা। মুখোমুখি বসে আছে ওরা দুজন তাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা সেই লেকের পাড়টায়। নীরবতা এসে যেন গ্রাস করলো সেই সময় টাকে । রঙ্গন নীল আকাশটার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টি ফেলে হাঁ করে তাকিয়ে আছে ।আর রোদসী তাকিয়ে আছে রঙ্গনের সেই মায়াবী মুখটার দিকে যা বরাবরই রোদসীকে পাগল করে দেয়। তাই হয়তো রোদসী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের পৃথিবী খুজার চেষ্টা করছে।
আস্তে আস্তে রঙ্গনের হাত খুব শক্ত করে চেপে ধরে ও। রঙ্গন কিছুই বলে না । তাকিয়ে থাকে এই অবুঝ বালিকা টির মুখে দিকে । নিজেকে খুব বেশি সুখি মনে হয় রঙ্গনের । এই বালিকা টিই কেমন করে জানি পাল্টে দিয়েছে রঙ্গনের পুরো জীবনটাকে । অগুছালো রঙ্গন আজ অনেকটাই গুছালো ।
এখন শুধুই রোদসী কে হারানোর ভয়টা বার বার হানা দেয় রঙ্গনের মনে ।সারা জীবন ওর পাশে থাকতে পারবে তো ।
-এই রঙ্গন কোন কথা বলছো না কেন? নীরবেই বসে থাকব নাকি সারাক্ষন ।
-হুম,নীরবতার মাঝেই ভালবাসা অনুভব করা সব থেকে বেশী । ভালবাসা গাঢ় হয় নীরবতার মাঝেই।
রোদসী আর কিছু বলে না । নিজের মাথাটা এলিয়ে দেয় রঙ্গনের বুকের মাঝে। রঙ্গন আরও শক্ত করে রোদসীর হাতটা ধরে। ওর চুলের চিরচেনা ঘ্রানটা পাগল করে দেয় রঙ্গনকে। অদ্ভূত শিহরনে কেপে কেপে উঠে রঙ্গনের সমস্ত অনুভৃতি। দূর থেকে নীরবতার একটা অদ্ভুত শব্দআসে যা রঙ্গনের বুকের বাম পাশের শব্দটার সাথে মিশে যায় । রঙ্গনের বুকের মাঝে কান পেতে খাকা রোদসী স্পষ্ট শুনতে পায় সেই শব্দটা কি বলছে ।লজ্জায় চোখ বন্ধ করে রোদসী নিজের গায়ে সেই অদ্ভৃত শব্দটার পরশ মাখে ।আগের চেয়ে আরও বেশি ভালবেসে ফেলে এই মানুষটিকে ।
আনন্দে কেঁদে ফেলে রোদসী।নোনা জলে ভিজিয়ে দেয় রঙ্গনের ছাই রংগের শার্টটা । রঙ্গন শুধুই অবুঝ বালিকাটির কান্না শব্দ শুনে। রঙ্গন ঠের পায় ওর চোখের পাতাও ভিজে গেছে এই বালিকা টির পবিত্র স্পর্শে ।
[বি: দ্র: আমি জানি না রঙ্গন আর রোদসীর পরের দিন গুলো কেমন যাবে? ওদের ভবিষ্যত্‍ কি হবে? পারবে কি ওরা সারা জীবন একসাথে থাকতে।? আমি আর লিখতে পারছি না । আমার হাত কাপছে।
তবে আজকের দিনটা সবার যেন,ওদের দিনটার মতই সুখে কাটে ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন